রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১২
কবি ও কবিতা - জীবনানন্দ দাশ - স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
জীবনানন্দের কবিতার সাথে আজ ৩য় আড্ডা। আগের পর্বগুলিতে আমরা জেনেছিলাম রূপসী বাংলার এই কবির শৈশব, বাল্য ও শিক্ষাকাল সম্পর্কে। সেই সাথে দেখেছিলাম তার অনবদ্য কিছু কবিতা। আজকে কবির আরো একটা জনপ্রিয় দুটি কবিতা ‘আকাশলীনা’ ও সুরঞ্জনা নিয়ে মেতে ঊঠতে চাই। অসম্ভব রকমের সুন্দর এই কবিতা দু’টিতে কবি মনের যে প্রেমের আকুলি বিকুলি ফুটে উঠেছে তা আরও হাজারো বছর আমাদের মনে গেঁথে থাকবে। আমার মনে হয় বাংলা কবিতায় আকাশলীনা’র এর চেয়ে বেশি পাঠিত আর কোন কবিতা নাই। তার আগে জেনে নেই কবির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও কলকাতার জীবন কাহিনী।
বরিশালে প্রত্যাবর্তন
১৯৩৫ সালে জীবনানন্দ তার পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্রজমোজন কলেজে ফিরে যান, যা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত ছিল। তিনি সেখানকার ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সে সময়ে কলকাতায় বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং সমর সেন একটি আনকোড়া নতুন কবিতা পত্রিকা বের করার তোড়জোড় করছিলেন, যার নাম দেয়া হয় কবিতা। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যাতেই জীবনানন্দের একটি কবিতা স্থান করে নেয়, যার নাম ছিল ‘মৃত্যুর আগে’। কবিতাটি পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুদ্ধদেবকে লেখা একটি চিঠিতে মন্তব্য করেন কবিতাটি ‘চিত্ররূপময়’। কবিতা পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতে (পৌষ ১৩৪২ সংখ্যা; ডিসে ১৯৩৪/জানু ১৯৩৫) তার কিংবদন্তিতুল্য বনলতা সেন কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এই ১৮ লাইনের কবিতাটি বর্তমানে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতার অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। পরের বছর জীবনানন্দের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পান্ডুলিপি প্রকাশিত হয়। জীবনানন্দ এর মধ্যেই বরিশালে সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯৩৬ এর নভেম্বরে তার পুত্র সমরানন্দের জন্ম হয়। ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতা সংকলন সম্পাদনা করেন, যার নাম ছিল বাংলা কাব্য পরিচয় এবং এতে জীবনানন্দের মৃত্যুর আগে কবিতাটি স্থান পায়। ১৯৩৯ সালে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয় আবু সয়ীদ আইয়ুব ও হিরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়; এতে জীবনানন্দের চারটি কবিতা পাখিরা, শকুন, বনলতা সেন এবং নগ্ন নির্জন হাত অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪২ সালে কবির পিতৃবিয়োগ হয় এবং ঐ বছরেই তার তৃতীয় কবিতাগ্রন্থ বনলতা সেন প্রকাশিত হয়। বইটি বুদ্ধদেব বসুর কবিতা-ভবন হতে ‘এক পয়সায় একটি’ সিরিজের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং এর পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ষোল। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন জীবনানন্দের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এবং তার সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায় জীবনানন্দের বহু সংখ্যক কবিতা ছাপা হয়। ১৯৪৪ সালে তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ মহাপৃথিবী প্রকাশিত হয়। এর আগের তিনটি কাব্যগ্রন্থ তাকে নিজের পয়সায় প্রকাশ করতে হয়েছিল, তবে মহাপৃথিবীর জন্যে প্রকাশক পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে প্রকাশিত এই কবিতাগুচ্ছে যুদ্ধের ছাপ স্পষ্ট।
কলকাতা জীবন: চূড়ান্ত— পর্ব
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠে। জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের জন্যে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানান। এর ফলে বাংলা দ্বিখন্ডিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে, কারণ এর পূর্ব অংশ ছিল মুসলমান সংখ্যাপ্রধান আর পশ্চিমাংশে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগুরু। ১৯৪৭ এর দেশভাগ পূর্ববর্তী ঐ সময়টিতে বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিভৎস রূপে দেখা দেয়। জীবনানন্দ সব সময়ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন। কলকাতায় যখন ১৯৪৬ সালে আবার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। কবি তখন লেখেন ১৯৪৬-৪৭ কবিতাটি। দেশবিভাগের কিছু আগে তিনি বি.এম. কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে কলকাতায় চলে যান। পরে তিনি আর পূর্ববঙ্গে ফিরে যাননি। কলকাতায় তিনি দৈনিক স্বরাজপত্রিকার রোববারের সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনা করেন কয়েক মাস। ১৯৪৮ খৃস্টাব্দে তিনি দু’টি উপন্যাস লিখেছিলেন মাল্যবান ও সুতীর্থ, তবে আগেরগুলোর মতো ও দুটিও প্রকাশ করেননি। এ বছরের ডিসেম্বরে তাঁর পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ সাতটি তারার তিমির প্রকাশিত হয়। একই মাসে কলকাতায় তার মাতা কুসুমকুমারী দাশের জীবনাবসান ঘটে। ইতোমধ্যেই জীবনানন্দ কলকাতার সাহিত্যিক সমাজে নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন। তিনি ‘সমকালীন সাহিত্যকেন্দ্র’ নামে একটি সংস্থার সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন এবং এই সংস্থার মুখপত্র দ্বন্ধ পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক নিযুক্ত হন। মাঝে তিনি কিছুকাল খড়গপুর কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৫২ খৃস্টাব্দে তাঁর জনপ্রিয় কবিতার বই বনলতা সেন সিগনেট প্রেস কর্তৃক পরিবর্ধিত আকারে প্রকাশিত হয়। বইটি পাঠকানুকূল্য লাভ করে এবং নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন-কর্তৃক ঘোষিত “রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরষ্কার” জয় করে। ১৯৫৪ খৃস্টাব্দের মে মাসে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা। বইটি ১৯৫৫ খৃস্টাব্দে ভারত সরকারের “সাহিত্য একাডেমি” পুরষ্কার লাভ করে।
আকাশলীনা
সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,
বোলো নাকো কথা এই যুবকের সাথে কথা;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
দূর থেকে দূরে আরো দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেয়ো নাকো আর ।
কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে ।
আকাশের আড়ালে আকাশে
মৃত্তিকার মতো তুমি আজ :
তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে ।
সুরঞ্জনা,
তোমার হৃদয়ে আজ ঘাস :
বাতাসের ওপারে বাতাস
আকাশের ওপারে আকাশ ।
সুরঞ্জনাকে ‘ঐ যুবকের’ সাথে কথা বলতে বারন করেছিলেন জীবনানন্দ দাস — পুরুষ মনের চিরন্তন আকুতি এটা। মানব পুরুষের কাছে তার এই আকুতির আবেদনের অর্থ অগম্য নয় বোধগম্য কারনে, সঙ্গিবিহীন পুরুষও বোঝে “ঐ যুবকের” সাথে কথা বললে মনে কতটা চোট লাগে নারীর কাছেও পুরুষের এই আকুতি অপরিচিত নয়।
সুরঞ্জনা
সুরঞ্জনা, আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছো;
পৃথিবীর বয়সিনী তুমি এক মেয়ের মতন;
কালো চোখ মেলে ওই নীলিমা দেখেছ;
গ্রীক হিন্দু ফিনিশিয় নিয়মের রূঢ় আয়োজন
শুনেছ ফেনিল শব্দে তিলোত্তমা-নগরীরর গায়ে
কী চেয়েছে? কী পেয়েছে — গিয়েছে হারায়ে।
বয়স বেড়েছে ঢের নরনারীদের,
ঈষৎ নিভেছে সূর্য নক্ষত্রের আলো;
তবুও সমুদ্র নীল: ঝিনুকের গায়ে আলপনা;
একটি পাখির গান কী রকম ভালো।
মানুষ কাউকে চায়, তার সেই নিহত উজ্জ্বল
ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোন সাধনার ফল।
মনে পড়ে কবে এক তারাভরা রাতের বাতাসে
ধর্মাশোকের ছেলে মহেন্দ্রের সাথে
উতরোল বড় সাগরের পথে অস্তিম আকাঙ্কা নিয়ে প্রাণে
তবুও কাউকে আমি পারিনি বোঝাতে
সেই ইচ্ছা সঙ্ঘ নয় শক্তি নয় কর্মীদের সুধীদের বিবর্ণতা নয়,
আরো আলো: মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়।
যেন সব অন্ধকার সমুদ্রের ক্লান্ত নাবিকেরা।
মক্ষিকার গুঞ্জনের মতো এক বিহ্বল বাতাসে
ভূমধ্যসারলীন দূর এক সভ্যতার থেকে
আজকের নব সভ্যতায় ফিরে আসে;
তুমি সেই অপরূপ সিন্ধু রাত্রি মৃতদের রোল
দেহ দিয়ে ভালোবেসে, তবু আজ ভোরের কল্লোল।
কে এই সুরঞ্জনা-প্রেমিকা না দেশের কথা বলছেন। একবারে মনে হয় এক নারীর কথা বলছেন আবার মনে হয় না বাংলার কথা বলেছেন। এমন সুন্দর করে কেউ তার প্রেয়সীর কথা বলতে পারে! জীবনান্দের স্বভাব প্রকৃতি বিবেচনায় আমার ধারনা কবিতাটিতে কবি রুপসী বাংলার কথাই বলতে চেয়েছেন। বাংলাই ছিল তার প্রেম ভালবাসা। আমারা কি তার মত প্রেয়সীর কথা বলতে পারব!
কবি ও কবিতা - জীবনানন্দ দাশ রুপসী বাংলার কবি
বনলতা সেন - আমাদের সবারই পড়া একটি কবিতা। প্রেমের ক্লাসে ভর্তির প্রথম শর্তই ছিল, বনলতা সেন মুখস্থ থাকতে হবে।
তবে আমার এক বন্ধু প্রবাসে এক বাংগালি মেয়ে বন্ধুকে বলেছিল –
- তোমাকে বনলতা সেনের মত লাগে।
- কার মত, কৈ’লা?
- ব-ন-ল-তা সেনের মত (কাচুমাচু)!
কারন ততক্ষনে সে বুঝে গেছে এই মাইয়া বনলতা সেনের নাম শুনে নাই।
- হেইডা আবার কেডা (রাগত)? তোমার এক্স গার্ল ফেন্ড নাকি (উর্দ্ধে উঠছে)? তাইলে তার কাছেই যাও। আমার মাঝে তারে খুইছতাছ কেন?
মর জ্বালা। আমি যাই বংগে কপাল আসে না সংগে। আমাদের আজকে কবি জীবনানন্দ দাশ ও তার কবিতা।

জীবনানন্দ দাশ (১৭ ফেব্রুয়ারী, ১৮৯৯, বরিশাল - অক্টোবর ২২, ১৯৫৪) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাংলা কবি। তিনি প্রধানত কবি হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা ও প্রকাশ করেছেন। তবে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে অকাল মৃত্যুর আগে তিনি নিভৃতে ১৪টি উপন্যাস এবং ১০৮টি ছোটগল্প রচনা গ্রন্থ করেছেন যার একটিও তিনি জীবদ্দশায় প্রকাশ করেন নি। রবীন্দ্রনাথ তার কাব্য প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন – তোমার কবিতায় কাব্যরস যথেষ্ট পরিমানে রয়েছে।
শৈশব
জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের জেলাশহর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণা নিবাসী। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৯৩৮-৮৫) বিক্রমপুরথেঁকে স্থানান্তরিত হয়ে বরিশালে আবাস গাড়েন। জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্তের সর্বাসন্দের দ্বিতীয় পুত্র। সত্যানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৬৩-১৯৪২) ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক এবং ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। জীবনানন্দের মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি, তার সুপরিচিত কবিতা আদর্শ ছেলে (আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে) আজও শিশুশ্রেণীর পাঠ্য। জীবনানন্দ ছিলেন পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। তার ডাকনাম ছিল মিলু।
আমার মতে এই বনলতা সেন আর কেউ না – সে আমাদেরই বাংলাদেশ। সমস্ত পৃথিবি ঘুরে এসে কেবল নিজের দেশে এলেই এই শান্তি পাওয়া যায়। যে রুপের বর্ননা তিনি করেছে তা যে বাংলার রুপের সাদৃশ্য সহজেই মেলে। বনলতা সেন থাকুক বা নাই থাকুক কিংবা যেই হোন, বাংলা ভাষার ইতিহাসে এত জনপ্রিয় কবিতা আর দ্বিতিয়টি নাই। কবিতাটি প্রকাশের পর থেকে আজ পর্যন্ত্য তরুণ পাঠকদের এমন করে আকৃষ্ট করে রেখেছে - কবি নিজেও তখন বিস্মিত হয়েছিলেন, আজও আমরা বিস্মিত হই। ১৯৫৩ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনে ১৯৫২-র শ্রেষ্ঠ কাব্যের স্বীকৃতি লাভ করে 'বনলতা সেন'। জীবদ্দশায় এই একটি পুরস্কার পেয়েছিলেন কবি, এই 'বনলতা সেন'-রই জন্য।
গেল পৌষেই পুরো হলো 'বনলতা সেন' কবিতা প্রকাশের ৭৫ বছর। রহস্যময়তা, সৌন্দর্য আর কবির গভীর অনুভব কবিতাটিকে এমন এক চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে যে বনলতা সেন হয়ে উঠেছেন চিরকালের নারী, চিরসুন্দরী, অক্ষয়-অমর এক চিরপ্রার্থিত প্রেমিকা। এমন যার অবস্থান, সেখানে বনলতা বলে সত্যিই কেউ ছিল কি না, কী দরকার তার রহস্য উন্মোচনের? বরং চির অটুট থাক তার আবেদন ও সৌন্দর্য।
ছোট পরিসরে তাকে সাজাতে গেলে নিজেদেরকে বঞ্চিত করা হবে। তাই কয়েক পর্বে ভাগ করা হয়েছে। পরের পর্বে থাকবে – কবির আরও একটা অমর কবিতা – “রুপসী বাংলা”। সেই পর্যন্ত্য সবাই ভাল থাকুন আর সাথেই থাকুন।
তবে আমার এক বন্ধু প্রবাসে এক বাংগালি মেয়ে বন্ধুকে বলেছিল –
- তোমাকে বনলতা সেনের মত লাগে।
- কার মত, কৈ’লা?
- ব-ন-ল-তা সেনের মত (কাচুমাচু)!
কারন ততক্ষনে সে বুঝে গেছে এই মাইয়া বনলতা সেনের নাম শুনে নাই।
- হেইডা আবার কেডা (রাগত)? তোমার এক্স গার্ল ফেন্ড নাকি (উর্দ্ধে উঠছে)? তাইলে তার কাছেই যাও। আমার মাঝে তারে খুইছতাছ কেন?
মর জ্বালা। আমি যাই বংগে কপাল আসে না সংগে। আমাদের আজকে কবি জীবনানন্দ দাশ ও তার কবিতা।
জীবনানন্দ দাশ (১৭ ফেব্রুয়ারী, ১৮৯৯, বরিশাল - অক্টোবর ২২, ১৯৫৪) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাংলা কবি। তিনি প্রধানত কবি হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা ও প্রকাশ করেছেন। তবে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে অকাল মৃত্যুর আগে তিনি নিভৃতে ১৪টি উপন্যাস এবং ১০৮টি ছোটগল্প রচনা গ্রন্থ করেছেন যার একটিও তিনি জীবদ্দশায় প্রকাশ করেন নি। রবীন্দ্রনাথ তার কাব্য প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন – তোমার কবিতায় কাব্যরস যথেষ্ট পরিমানে রয়েছে।
শৈশব
জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের জেলাশহর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণা নিবাসী। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৯৩৮-৮৫) বিক্রমপুরথেঁকে স্থানান্তরিত হয়ে বরিশালে আবাস গাড়েন। জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্তের সর্বাসন্দের দ্বিতীয় পুত্র। সত্যানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৬৩-১৯৪২) ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক এবং ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। জীবনানন্দের মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি, তার সুপরিচিত কবিতা আদর্শ ছেলে (আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে) আজও শিশুশ্রেণীর পাঠ্য। জীবনানন্দ ছিলেন পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। তার ডাকনাম ছিল মিলু।
১৯৪২ সালে প্রথম প্রকাশে ‘বনলতা সেন’-এর প্রচ্ছদ আর্টস সংস্করণের প্রচ্ছদ হিসেবে ব্যবহার করা
বনলতা সেন
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি ; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি ; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের 'পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে , ' এতোদিন কোথায় ছিলেন?'
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে--সব নদী--ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
আমার মতে এই বনলতা সেন আর কেউ না – সে আমাদেরই বাংলাদেশ। সমস্ত পৃথিবি ঘুরে এসে কেবল নিজের দেশে এলেই এই শান্তি পাওয়া যায়। যে রুপের বর্ননা তিনি করেছে তা যে বাংলার রুপের সাদৃশ্য সহজেই মেলে। বনলতা সেন থাকুক বা নাই থাকুক কিংবা যেই হোন, বাংলা ভাষার ইতিহাসে এত জনপ্রিয় কবিতা আর দ্বিতিয়টি নাই। কবিতাটি প্রকাশের পর থেকে আজ পর্যন্ত্য তরুণ পাঠকদের এমন করে আকৃষ্ট করে রেখেছে - কবি নিজেও তখন বিস্মিত হয়েছিলেন, আজও আমরা বিস্মিত হই। ১৯৫৩ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনে ১৯৫২-র শ্রেষ্ঠ কাব্যের স্বীকৃতি লাভ করে 'বনলতা সেন'। জীবদ্দশায় এই একটি পুরস্কার পেয়েছিলেন কবি, এই 'বনলতা সেন'-রই জন্য।
গেল পৌষেই পুরো হলো 'বনলতা সেন' কবিতা প্রকাশের ৭৫ বছর। রহস্যময়তা, সৌন্দর্য আর কবির গভীর অনুভব কবিতাটিকে এমন এক চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে যে বনলতা সেন হয়ে উঠেছেন চিরকালের নারী, চিরসুন্দরী, অক্ষয়-অমর এক চিরপ্রার্থিত প্রেমিকা। এমন যার অবস্থান, সেখানে বনলতা বলে সত্যিই কেউ ছিল কি না, কী দরকার তার রহস্য উন্মোচনের? বরং চির অটুট থাক তার আবেদন ও সৌন্দর্য।
ছোট পরিসরে তাকে সাজাতে গেলে নিজেদেরকে বঞ্চিত করা হবে। তাই কয়েক পর্বে ভাগ করা হয়েছে। পরের পর্বে থাকবে – কবির আরও একটা অমর কবিতা – “রুপসী বাংলা”। সেই পর্যন্ত্য সবাই ভাল থাকুন আর সাথেই থাকুন।
কবি ও কবিতা - জীবনানন্দ দাশ - সাহিত্যচর্চা ও জীবনসংগ্রাম
বাংলা সাহিত্যের এক অমর অধ্যায়ের সুচনা হয়েছিল কবি জীবনানন্দ থেকে। সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন জীবনানন্দ দাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’। ৩৫ টি কবিতা সম্মিলিত এই কাব্য গ্রন্থের প্রতিটা কবিতায় রয়েছে সমাজের কথা, আমাদের কথা। ‘হিন্দু-মুসলমান’ কবিতায় দেখতে পাই ভিন্ন বিশ্বাসের মিলন - পুজার ঘন্টা মিশিছে হরষে নামাজের সুরে সুরে। সময়ের প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে শুধু এই লাইনক'টি থেকেই কবি মনের আধুনিকতা এবং রুচিশীল চিন্তা-চেতনা প্রতিফলিত হয়। কেবল তাই নয়। রাজার দুলালের সুখ থেকে শুরু করে পতিতার কষ্ট পর্যন্ত্য ছুঁয়েছে কবির শিশু মন। ‘পতিতা’তে তিনি বলেছেন, মানুষ তবু সে, - তার চেয়ে বড়ো, - সে যে নারী, সে যে নারী। বিষ্মিত হতে হয় কবি মনের প্রেম দেখে। কাকে ভালবাসেন নি তিনি, কার কথা বলেন নি তিনি!
এই পর্যন্ত্য যারা আমার সাথে, জীবনানন্দ দাশের কবিতার আসরে আড্ডা দিয়ে আসছেন তাদের প্রত্যেককে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আজ আমরা কবির একটি ব্যতিক্রমি কবিতা নিয়ে মেতে উঠতে চাই। আজকে দেখব “আট বছর আগের একদিন” কবিতার নাড়ি নক্ষত্র। তার আগে জেনে নেই কবির সাহিত্যচর্চা ও জীবনসংগ্রাম
সাহিত্যচর্চা ও জীবনসংগ্রাম
জীবনানন্দের সাহিত্যিক জীবন বিকশিত হতে শুরু করে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৫ এর জুনে মৃত্যুবরণ করলে জীবনানন্দ তার স্মরণে 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' নামক একটি কবিতা রচনা করেন, যা বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটি পরবর্তীতে তার প্রথম কাব্য সংকলন ঝরা পালকে স্থান করে নেয়। কবিতাটি পড়ে কবি কালিদাস রায় মন্তব্য করেছিলেন এ কবিতাটি নিশ্চয়ই কোন প্রতিষ্ঠিত কবির ছদ্মনামে রচনা। ১৯২৫ সালেই তার প্রথম প্রবন্ধ স্বর্গীয় কালীমোহন দাশের শ্রাদ্ধবাসরে প্রবন্ধটি ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার পরপর তিনটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ঐ বছরেই কল্লোলে 'নীলিমা' কবিতাটি প্রকাশিত হলে তা অনেক তরুণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ধীরে ধীরে কলকাতা, ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতে থাকে; যার মধ্যে রয়েছে সে সময়কার সুবিখ্যাত পত্রিকা কল্লোল, কালি ও কলম, প্রগতি প্রভৃতি। ১৯২৭ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয়। সে সময় থেকেই তিনি তার উপাধি দাশগুপ্তের বদলে কেবল দাশ লিখতে শুরু করেন।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কয়েক মাসের মাথাতেই তিনি সিটি কলেজে তার চাকরিটি হারান। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কলেজটিতে ছাত্র অসন্তোষ দেখা দেয়, ফলাফলস্বরূপ কলেজটির ছাত্রভর্তির হার আশঙ্কাজনকহারে কমে যায়। জীবনানন্দ ছিলেন কলেজটির শিক্ষকদের মধ্যে কনিষ্ঠতম এবং অর্থনৈতিক অসুবিধার পড়ে কলেজ তাকেই চাকরিচ্যুত করে। কলকাতার সাহিত্যচক্রেও সে সময় তার কবিতা কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হয়। সে সময়কার প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক সজনীকান্ত দাশ শনিবারের চিঠি পত্রিকায় তার রচনার নির্দয় সমালোচনায় প্রবৃত্ত হন। কলকাতায় করবার মতোন কোন কাজ ছিল না বিধায় কবি ছোট্ট শহর বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে তিন মাস পরেই তিনি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ সময় তিনি চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়েছিলেন। জীবনধারণের জন্যে তিনি টিউশানি করাতেন এবং সাথে সাথে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সন্ধান করছিলেন। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। বরিশালে তার পরিবার তার বিয়ের আয়োজন করছিল এবং ১৯৩০ সালের ৯ই মে তারিখে তিনি লাবণ্য দেবীর সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ে হয়েছিলো ঢাকায়, ব্রাহ্ম সমাজের রামমোহন লাইব্রেরিতে।[৪] বিয়ের পর আর দিল্লিতে ফিরে যাননি তিনি, ফলে সেখানকার চাকরিটি খোয়ান। এরপর প্রায় বছর পাঁচেক সময় জীবনানন্দ কর্মহীন অবস্থায় ছিলেন। মাঝে কিছু দিন ইনশিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছেন, ছোট ভাই এর কাছ থেকে অর্থ ধার করে ব্যবসার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোনটাই স্থায়ী হয়নি।
১৯৩১ সালে কবির প্রথম সন্তান মঞ্জুশ্রীর জন্ম হয়। প্রায় সে সময়েই তার ক্যাম্পে কবিতাটি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং সাথে সাথে তা কলকাতার সাহিত্যসমাজে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়। কবিতাটির আপাত বিষয়বস্তু ছিল জোছনা রাতে হরিণ শিকার। অনেকেই এই কবিতাটি পাঠ করে তা অশ্লীল হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি তার বেকারত্ব, সংগ্রাম ও হতাশার এই সময়কালে বেশ কিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনা করেছিলেন, তবে তার জীবদ্দশায় সেগুলো প্রকাশিত হয়নি। ১৯৩৪ সালে তিনি একগুচ্ছ কবিতা রচনা করেন যা পরবর্তীতে তার রূপসী বাংলা কাব্যের প্রধান অংশ নির্মাণ করে। জীবনানন্দ এ কবিতাগুলো প্রকাশ করেননি এবং তার মৃত্যুর পর কবিতাগুলো একত্র করে ১৯৫৭ সালে রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। (উইকি)
আট বছর আগের একদিন
শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হল তার সাধ ।
বধু শূয়েছিল পাশে, শিশুটিও ছিল;
প্রেম ছিল, আশা ছিল - জোছনায় - তবু সে দেখিল
কোন ভূত? ঘুম কেন ভেংগে গেল তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল - লাশ কাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার ।
এই ঘুম চেয়েছিলে বুঝি !
রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইদুরের মত ঘাড় গুজি
আঁধার ঘুজির বুকে ঘুমায় এবার ;
কোনদিন জাগিবে না আর ।
‘কোনদিন জাগিবে না আর
জানিবার গাঢ় বেদনার
অবিরাম অবিরাম ভার
সহিবে না আর -’
এই কথা বলেছিল তারে,
চাঁদ ডুবে গেলে - অদ্ভুত আঁধারে
যেন তার জানালার ধারে
উটের গ্রীবার মত কোন এক নিস্তব্ধতা এসে ।
তবুও তো পেঁচা জাগে;
গলিত স্থবির ব্যাংগ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
কয়েক্টি প্রভাতের ইশারায় -অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে ।
টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারি দিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;
মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থাকে জীবনের স্রোত ভালবেসে ।
রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি ;
সোনালী রোদের ঢেইয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কত দেখিয়াছি ।
ঘনিষ্ট আকাশ যেন, কোন বিকীর্ণ জীবন
অধিকার করে আছ ইহাদের মন ।
দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িংয়ের ঘন শিহরণ
মরনের সাথে লড়িয়াছে;
চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বত্থের কাছে
একগাছা দড়ি হাতে নিয়ে গিয়েছিলে তবু একা একা,
যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের - মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা,
এই জেনে ।
অশ্বথের শাখা
করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকীর ভিড় এসে সোনালী ফুলের স্নিগ্ধ ঝাকে
করে নি কি মাখা মাখি ?
থুর থুরে অন্ধ পেঁচা এসে
বলে নি কিঃ ‘ বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?
চমৎকার! —
ধরা যাক দুই একটা ইদুর এবার !
জানায় নি কি পেঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার ?
জীবনের এই স্বাদ - সুপক্ক যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকালের -
তোমার অসহ্য বোধ হ'ল;
মর্গে কি হৃদয় জুড়ালো
মর্গে - গুমোটে
থ্যাঁতা ইদুরের মত রক্তমাখা ঠোঁটে !
শোনো
তবুও এ মৃতের গল্প; - কোন
নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই ;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখেনি কোন খাদ ।
সময়ের উদবর্তনে উঠে আসে বধু
মধু - আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;
হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে
এ জীবন কোনদিন কেঁপে ওঠে নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হ'য়ে শূয়ে আছে টেবিলের ‘পরে ।
জানি - তবু জানি
নারীর হৃদয় - প্রেম -শিশূ - গৃহ- নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় -
আরো এক বিপন্ন বিষ্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে;
ক্লান্ত ক্লান্ত করে ;
লাশ কাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই,
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শূয়ে আছে টেবিলের ‘পরে ।
তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা,
থুরথুরে অন্ধ প্যাঁচা অশ্বত্থের ডালে বসে এসে,
চোখ পাল্টায়ে কয়ঃ ‘ বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?
চমৎকার!
ধরা যাক দুই একটা ইদুর এবার –
হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজো চমৎকার?
আমিও তোমার মত বুড়ো হবো - বুড়ি চাঁদটারে আমি
ক'রে দেব কালীদহে বেনোজলে পার;
আমরা দু'জনে মিলে শূন্য ক'রে চ'লে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার ।
আশা নিরাশার এই কবিতাটি কবিকে অনেকের কাছেই রহস্যময় করে তুলেছে। প্রথম অংশেই পরিস্কার বুঝা গেছে একটি অপমৃত্যুর পটভুমি। নিন্দুকেরা কবির মৃত্যু নিয়েও তাই উপহাস করেছে। অথচ কবিতাটি মন দিয়ে পড়লে বুঝা যায় – আত্নহননকে কবি কোথাও স্বিকৃতি দেননি।
“প্রেম ছিল, আশা ছিল - জোছনায় - তবু সে দেখিল
কোন ভূত? ঘুম কেন ভেংগে গেল তার?”
এর পরেও কি সন্দেহ থাকে কবি একজন আশাবাদী জাগতিক কবি! থ্যাতলে যাওয়া যে ব্যাঙ সেওত বাচতে চায়, তোমার কি হল যে নিজেকে শেষ করে দিতে হবে!
শোনো তবুও এ মৃতের গল্প; - কোন
নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই ;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখেনি কোন খাদ ।
তাহলে, কোন প্রত্যয়ে নিজেকে মৃত্যুর দুয়ারে দাড় করানো! কেন এই আত্নহনন! এর উত্তরে কবি আমাদেরকে পথের মাঝে ফেলে রেখে যাননি।
জানি - তবু জানি নারীর হৃদয় - প্রেম -শিশূ - গৃহ- নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় - আরো এক বিপন্ন বিষ্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে; ক্লান্ত ক্লান্ত করে ;
এই আমাদের কবি জীবনানন্দ দাশ, প্রেমের কবি, মানুষের কবি, যৌবনের কবি, মাটির কবি, ফসলের কবি, এই বাংলার কবি – আমাদের প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ ।
রুপসী বাংলার কবি : তোমার জন্মদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরি ...
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে বরিশাল শহরে জন্ম কবি জীবনানন্দ দাস এর।
পিতা সত্যানন্দ দাশ, মাতা কুসুমকুমারী দাস। পিতা সত্যানন্দ দাস বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন এবং তার মাতা কুসুমকুমারী কবিতা লিখতেন।
১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে বি এম কলেজ থেকে আই.এ. পাস করেন তিনি।এরপর ১৯১৯ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজীতে বিএ এবং একই কলেজ থেকে ১৯১৯ সালে তিনি এমএ পাস করেন। জীবনানন্দ দাস বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে তার চাকুরী জীবন শুরু করেন। প্রথমে তিনি কলকাতা সিটি কলেজে ১৯২২ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এরপর তিনি অল্প সময়ের জন্য মাত্র প্রতিষ্ঠিত বাগেরহাট প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ এ শিক্ষকতা করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি বরিশালের বিএম কলেজে যোগদান করেন এবং ১৯৪৭ সালের দেশ ভঙ্গের আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। এরপর তিনি কলকাতায় চলে যান।
জীবনানন্দ দাস খুব অল্প বয়স থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন। ছাত্র থাকাবস্থায় তার কবিতা “বর্যা আবাহন” “ব্রহ্মবাদী”-তে ছাপা হয়। তার অনেক কবিতাই বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তিনি একজন শক্তিমান প্রগতিশীল আধুনিক কবি। তার কাব্যগ্রন্থ ‘রূপসী বাংলা’য় (১৯৫৭) আবহমান বাংলার রূপ প্রকাশিত। এ জন্য তাকে ‘রূপসী বাংলার কবি’ও বলা হয়। তার কাব্যগ্রন্থ: ‘ঝরাপালক’ (১৩৩৪ ব.), ‘ধূসর পান্ডুলিপি (১৩৪৩ ব.), ‘বনলতা সেন’ (১৩৪৯ ব.), ‘মহাপৃথিবী’ (১৩৫১ ব.), ‘সাতটি তারার তিমির’ (১৩৫৫ ব.), ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ (১৩৬৮ ব.)। ‘কবিতার কথা’ (১৩৬২ ব.) তার অসামান্য প্রবন্ধগ্রন্থ।
জীবনানন্দ দাসের কবিতা বাঙ্গালীদের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে অনেক প্রভাব ফেলেছে। তার কবিতা বাংলার অনেক মানুষের মাঝে দেশপ্রেম গড়ে তুলেছে। তার অনেক কবিতাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হতাশাগ্রস্থ মানুষের মাঝে বল প্রদান করেছে।
যদিও তিনি মূলত একজন কবি ছিলেন, তারপরও তিনি অনেক ছোট গল্প এবং উপন্যাস লিখেছেন। তার কিছু উপন্যাস : মাল্যবান, সুতীর্থ, জলপাইহাতি, জীবনপ্রনালী ও বাসমতীর উপখ্যান। তিনি প্রায় ২০০ এর অধিক গল্প লিখেছেন। জীবনানন্দ দাসের গল্প গ্রন্থে তার অনেক গল্প পাওয়া যাবে।
জীবনানন্দ ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার রাজপথে ট্রাক দুর্ঘটনায় আহত হন। ২২ অক্টোবর হাসপাতালে তার মৃত্যু ঘটে।
পিতা সত্যানন্দ দাশ, মাতা কুসুমকুমারী দাস। পিতা সত্যানন্দ দাস বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন এবং তার মাতা কুসুমকুমারী কবিতা লিখতেন।
১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে বি এম কলেজ থেকে আই.এ. পাস করেন তিনি।এরপর ১৯১৯ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজীতে বিএ এবং একই কলেজ থেকে ১৯১৯ সালে তিনি এমএ পাস করেন। জীবনানন্দ দাস বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে তার চাকুরী জীবন শুরু করেন। প্রথমে তিনি কলকাতা সিটি কলেজে ১৯২২ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এরপর তিনি অল্প সময়ের জন্য মাত্র প্রতিষ্ঠিত বাগেরহাট প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ এ শিক্ষকতা করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি বরিশালের বিএম কলেজে যোগদান করেন এবং ১৯৪৭ সালের দেশ ভঙ্গের আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। এরপর তিনি কলকাতায় চলে যান।
জীবনানন্দ দাস খুব অল্প বয়স থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন। ছাত্র থাকাবস্থায় তার কবিতা “বর্যা আবাহন” “ব্রহ্মবাদী”-তে ছাপা হয়। তার অনেক কবিতাই বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তিনি একজন শক্তিমান প্রগতিশীল আধুনিক কবি। তার কাব্যগ্রন্থ ‘রূপসী বাংলা’য় (১৯৫৭) আবহমান বাংলার রূপ প্রকাশিত। এ জন্য তাকে ‘রূপসী বাংলার কবি’ও বলা হয়। তার কাব্যগ্রন্থ: ‘ঝরাপালক’ (১৩৩৪ ব.), ‘ধূসর পান্ডুলিপি (১৩৪৩ ব.), ‘বনলতা সেন’ (১৩৪৯ ব.), ‘মহাপৃথিবী’ (১৩৫১ ব.), ‘সাতটি তারার তিমির’ (১৩৫৫ ব.), ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ (১৩৬৮ ব.)। ‘কবিতার কথা’ (১৩৬২ ব.) তার অসামান্য প্রবন্ধগ্রন্থ।
জীবনানন্দ দাসের কবিতা বাঙ্গালীদের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে অনেক প্রভাব ফেলেছে। তার কবিতা বাংলার অনেক মানুষের মাঝে দেশপ্রেম গড়ে তুলেছে। তার অনেক কবিতাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হতাশাগ্রস্থ মানুষের মাঝে বল প্রদান করেছে।
যদিও তিনি মূলত একজন কবি ছিলেন, তারপরও তিনি অনেক ছোট গল্প এবং উপন্যাস লিখেছেন। তার কিছু উপন্যাস : মাল্যবান, সুতীর্থ, জলপাইহাতি, জীবনপ্রনালী ও বাসমতীর উপখ্যান। তিনি প্রায় ২০০ এর অধিক গল্প লিখেছেন। জীবনানন্দ দাসের গল্প গ্রন্থে তার অনেক গল্প পাওয়া যাবে।
জীবনানন্দ ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার রাজপথে ট্রাক দুর্ঘটনায় আহত হন। ২২ অক্টোবর হাসপাতালে তার মৃত্যু ঘটে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যসমূহ (Atom)