রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

কবি ও কবিতা - জীবনানন্দ দাশ - সাহিত্যচর্চা ও জীবনসংগ্রাম


বাংলা সাহিত্যের এক অমর অধ্যায়ের সুচনা হয়েছিল কবি জীবনানন্দ থেকে। সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন জীবনানন্দ দাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’। ৩৫ টি কবিতা সম্মিলিত এই কাব্য গ্রন্থের প্রতিটা কবিতায় রয়েছে সমাজের কথা, আমাদের কথা। ‘হিন্দু-মুসলমান’ কবিতায় দেখতে পাই ভিন্ন বিশ্বাসের মিলন - পুজার ঘন্টা মিশিছে হরষে নামাজের সুরে সুরে। সময়ের প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে শুধু এই লাইনক'টি থেকেই কবি মনের আধুনিকতা এবং রুচিশীল চিন্তা-চেতনা প্রতিফলিত হয়। কেবল তাই নয়। রাজার দুলালের সুখ থেকে শুরু করে পতিতার কষ্ট পর্যন্ত্য ছুঁয়েছে কবির শিশু মন। ‘পতিতা’তে তিনি বলেছেন, মানুষ তবু সে, - তার চেয়ে বড়ো, - সে যে নারী, সে যে নারী। বিষ্মিত হতে হয় কবি মনের প্রেম দেখে। কাকে ভালবাসেন নি তিনি, কার কথা বলেন নি তিনি!



এই পর্যন্ত্য যারা আমার সাথে, জীবনানন্দ দাশের কবিতার আসরে আড্ডা দিয়ে আসছেন তাদের প্রত্যেককে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আজ আমরা কবির একটি ব্যতিক্রমি কবিতা নিয়ে মেতে উঠতে চাই। আজকে দেখব “আট বছর আগের একদিন” কবিতার নাড়ি নক্ষত্র। তার আগে জেনে নেই কবির সাহিত্যচর্চা ও জীবনসংগ্রাম







সাহিত্যচর্চা ও জীবনসংগ্রাম



জীবনানন্দের সাহিত্যিক জীবন বিকশিত হতে শুরু করে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৫ এর জুনে মৃত্যুবরণ করলে জীবনানন্দ তার স্মরণে 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' নামক একটি কবিতা রচনা করেন, যা বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটি পরবর্তীতে তার প্রথম কাব্য সংকলন ঝরা পালকে স্থান করে নেয়। কবিতাটি পড়ে কবি কালিদাস রায় মন্তব্য করেছিলেন এ কবিতাটি নিশ্চয়ই কোন প্রতিষ্ঠিত কবির ছদ্মনামে রচনা। ১৯২৫ সালেই তার প্রথম প্রবন্ধ স্বর্গীয় কালীমোহন দাশের শ্রাদ্ধবাসরে প্রবন্ধটি ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার পরপর তিনটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ঐ বছরেই কল্লোলে 'নীলিমা' কবিতাটি প্রকাশিত হলে তা অনেক তরুণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ধীরে ধীরে কলকাতা, ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতে থাকে; যার মধ্যে রয়েছে সে সময়কার সুবিখ্যাত পত্রিকা কল্লোল, কালি ও কলম, প্রগতি প্রভৃতি। ১৯২৭ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয়। সে সময় থেকেই তিনি তার উপাধি দাশগুপ্তের বদলে কেবল দাশ লিখতে শুরু করেন।



প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কয়েক মাসের মাথাতেই তিনি সিটি কলেজে তার চাকরিটি হারান। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কলেজটিতে ছাত্র অসন্তোষ দেখা দেয়, ফলাফলস্বরূপ কলেজটির ছাত্রভর্তির হার আশঙ্কাজনকহারে কমে যায়। জীবনানন্দ ছিলেন কলেজটির শিক্ষকদের মধ্যে কনিষ্ঠতম এবং অর্থনৈতিক অসুবিধার পড়ে কলেজ তাকেই চাকরিচ্যুত করে। কলকাতার সাহিত্যচক্রেও সে সময় তার কবিতা কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হয়। সে সময়কার প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক সজনীকান্ত দাশ শনিবারের চিঠি পত্রিকায় তার রচনার নির্দয় সমালোচনায় প্রবৃত্ত হন। কলকাতায় করবার মতোন কোন কাজ ছিল না বিধায় কবি ছোট্ট শহর বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে তিন মাস পরেই তিনি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ সময় তিনি চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়েছিলেন। জীবনধারণের জন্যে তিনি টিউশানি করাতেন এবং সাথে সাথে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সন্ধান করছিলেন। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। বরিশালে তার পরিবার তার বিয়ের আয়োজন করছিল এবং ১৯৩০ সালের ৯ই মে তারিখে তিনি লাবণ্য দেবীর সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ে হয়েছিলো ঢাকায়, ব্রাহ্ম সমাজের রামমোহন লাইব্রেরিতে।[৪] বিয়ের পর আর দিল্লিতে ফিরে যাননি তিনি, ফলে সেখানকার চাকরিটি খোয়ান। এরপর প্রায় বছর পাঁচেক সময় জীবনানন্দ কর্মহীন অবস্থায় ছিলেন। মাঝে কিছু দিন ইনশিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছেন, ছোট ভাই এর কাছ থেকে অর্থ ধার করে ব্যবসার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোনটাই স্থায়ী হয়নি।



১৯৩১ সালে কবির প্রথম সন্তান মঞ্জুশ্রীর জন্ম হয়। প্রায় সে সময়েই তার ক্যাম্পে কবিতাটি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং সাথে সাথে তা কলকাতার সাহিত্যসমাজে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়। কবিতাটির আপাত বিষয়বস্তু ছিল জোছনা রাতে হরিণ শিকার। অনেকেই এই কবিতাটি পাঠ করে তা অশ্লীল হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি তার বেকারত্ব, সংগ্রাম ও হতাশার এই সময়কালে বেশ কিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনা করেছিলেন, তবে তার জীবদ্দশায় সেগুলো প্রকাশিত হয়নি। ১৯৩৪ সালে তিনি একগুচ্ছ কবিতা রচনা করেন যা পরবর্তীতে তার রূপসী বাংলা কাব্যের প্রধান অংশ নির্মাণ করে। জীবনানন্দ এ কবিতাগুলো প্রকাশ করেননি এবং তার মৃত্যুর পর কবিতাগুলো একত্র করে ১৯৫৭ সালে রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। (উইকি)



আট বছর আগের একদিন



শোনা গেল লাশকাটা ঘরে

নিয়ে গেছে তারে;

কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আঁধারে

যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ

মরিবার হল তার সাধ ।



বধু শূয়েছিল পাশে, শিশুটিও ছিল;

প্রেম ছিল, আশা ছিল - জোছনায় - তবু সে দেখিল

কোন ভূত? ঘুম কেন ভেংগে গেল তার?

অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল - লাশ কাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার ।



এই ঘুম চেয়েছিলে বুঝি !

রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইদুরের মত ঘাড় গুজি

আঁধার ঘুজির বুকে ঘুমায় এবার ;

কোনদিন জাগিবে না আর ।



‘কোনদিন জাগিবে না আর

জানিবার গাঢ় বেদনার

অবিরাম অবিরাম ভার

সহিবে না আর -’

এই কথা বলেছিল তারে,

চাঁদ ডুবে গেলে - অদ্ভুত আঁধারে

যেন তার জানালার ধারে

উটের গ্রীবার মত কোন এক নিস্তব্ধতা এসে ।



তবুও তো পেঁচা জাগে;

গলিত স্থবির ব্যাংগ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে

কয়েক্টি প্রভাতের ইশারায় -অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে ।



টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে

চারি দিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;

মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থাকে জীবনের স্রোত ভালবেসে ।

রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি ;

সোনালী রোদের ঢেইয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কত দেখিয়াছি ।



ঘনিষ্ট আকাশ যেন, কোন বিকীর্ণ জীবন

অধিকার করে আছ ইহাদের মন ।

দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িংয়ের ঘন শিহরণ

মরনের সাথে লড়িয়াছে;

চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বত্থের কাছে

একগাছা দড়ি হাতে নিয়ে গিয়েছিলে তবু একা একা,

যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের - মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা,

এই জেনে ।



অশ্বথের শাখা

করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকীর ভিড় এসে সোনালী ফুলের স্নিগ্ধ ঝাকে

করে নি কি মাখা মাখি ?

থুর থুরে অন্ধ পেঁচা এসে

বলে নি কিঃ ‘ বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?

চমৎকার! —

ধরা যাক দুই একটা ইদুর এবার !

জানায় নি কি পেঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার ?



জীবনের এই স্বাদ - সুপক্ক যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকালের -

তোমার অসহ্য বোধ হ'ল;

মর্গে কি হৃদয় জুড়ালো

মর্গে - গুমোটে

থ্যাঁতা ইদুরের মত রক্তমাখা ঠোঁটে !

শোনো

তবুও এ মৃতের গল্প; - কোন

নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই ;

বিবাহিত জীবনের সাধ

কোথাও রাখেনি কোন খাদ ।

সময়ের উদবর্তনে উঠে আসে বধু

মধু - আর মননের মধু

দিয়েছে জানিতে;

হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে

এ জীবন কোনদিন কেঁপে ওঠে নাই;

তাই

লাশকাটা ঘরে

চিৎ হ'য়ে শূয়ে আছে টেবিলের ‘পরে ।



জানি - তবু জানি

নারীর হৃদয় - প্রেম -শিশূ - গৃহ- নয় সবখানি;

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় -

আরো এক বিপন্ন বিষ্ময়

আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে

খেলা করে;

আমাদের ক্লান্ত করে;

ক্লান্ত ক্লান্ত করে ;

লাশ কাটা ঘরে

সেই ক্লান্তি নাই,

তাই

লাশকাটা ঘরে

চিৎ হয়ে শূয়ে আছে টেবিলের ‘পরে ।



তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা,

থুরথুরে অন্ধ প্যাঁচা অশ্বত্থের ডালে বসে এসে,

চোখ পাল্টায়ে কয়ঃ ‘ বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?

চমৎকার!

ধরা যাক দুই একটা ইদুর এবার –



হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজো চমৎকার?

আমিও তোমার মত বুড়ো হবো - বুড়ি চাঁদটারে আমি

ক'রে দেব কালীদহে বেনোজলে পার;

আমরা দু'জনে মিলে শূন্য ক'রে চ'লে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার ।






আশা নিরাশার এই কবিতাটি কবিকে অনেকের কাছেই রহস্যময় করে তুলেছে। প্রথম অংশেই পরিস্কার বুঝা গেছে একটি অপমৃত্যুর পটভুমি। নিন্দুকেরা কবির মৃত্যু নিয়েও তাই উপহাস করেছে। অথচ কবিতাটি মন দিয়ে পড়লে বুঝা যায় – আত্নহননকে কবি কোথাও স্বিকৃতি দেননি।



“প্রেম ছিল, আশা ছিল - জোছনায় - তবু সে দেখিল

কোন ভূত? ঘুম কেন ভেংগে গেল তার?”




এর পরেও কি সন্দেহ থাকে কবি একজন আশাবাদী জাগতিক কবি! থ্যাতলে যাওয়া যে ব্যাঙ সেওত বাচতে চায়, তোমার কি হল যে নিজেকে শেষ করে দিতে হবে!



শোনো তবুও এ মৃতের গল্প; - কোন

নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই ;

বিবাহিত জীবনের সাধ

কোথাও রাখেনি কোন খাদ ।




তাহলে, কোন প্রত্যয়ে নিজেকে মৃত্যুর দুয়ারে দাড় করানো! কেন এই আত্নহনন! এর উত্তরে কবি আমাদেরকে পথের মাঝে ফেলে রেখে যাননি।



জানি - তবু জানি নারীর হৃদয় - প্রেম -শিশূ - গৃহ- নয় সবখানি;

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় - আরো এক বিপন্ন বিষ্ময়

আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে;

আমাদের ক্লান্ত করে; ক্লান্ত ক্লান্ত করে ;




এই আমাদের কবি জীবনানন্দ দাশ, প্রেমের কবি, মানুষের কবি, যৌবনের কবি, মাটির কবি, ফসলের কবি, এই বাংলার কবি – আমাদের প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন